বাংলাদেশে ভূমিকম্প: ঝুঁকি, প্রস্তুতি ও করণীয়
বাংলাদেশে গতকাল তিন দফা মৃদু ভূমিকম্প হয়েছে। এছাড়া ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রায় ৮ দশমিক ৬ মাত্রার প্রবল ভূমিকম্পের পর সুনামি সতর্কতা জারির পর তা প্রত্যাহার করা হয়েছে। প্রথমে সুনামি (Tsunami) সম্পর্কে একটু বলে নেই। সমুদ্র বা হ্রদের কোন বিস্তৃত এলাকার পানি সরে যাওয়ার ফলে যে ঢেউয়ের সৃষ্টি হয় তাকেই সুনামি বলে।
ভূমিকম্প (মূলত সমুদ্রের তলদেশে) সুনামি সৃষ্টি হওয়ার একটি প্রধান কারণ। ঘূর্ণিঝড়ের ফলে উপকূলীয় এলাকায় যে জলোচ্ছ্বাস হয় তার চেয়ে সুনামি বেশ ভিন্ন। আমরা জানি জলোচ্ছ্বাসের সময় আমাদের উপকূলে ঢেউয়ের উচ্চতা অনেক বেশি হয়, কারণ আমাদের উপকূলের মহীসোপান (continental shelf) বেশ অগভীর। কিন্তু সুনামির ক্ষেত্রে এটা আবার ‘শাপে বর’ অবস্থা অর্থাৎ এর প্রভাব বিপরীত। কারণ, সুনামি মূলত তরঙ্গের গতির ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশের উপকূলের মহীসোপান শুধু অগভীরই নয়, বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃতও (প্রায় ১০০ কিমি থেকে ২৫০ কিমি পর্যন্ত)। সুনামির তরঙ্গ উপকূলে যে গতি নিয়ে আসে স্বল্প গভীরতার জন্য ঘর্ষণপ্রাপ্ত হয়ে তা বেশী দূর অগ্রসর হওয়ার কথা নয়। আবার বিস্তৃত মহীসোপানের শেষ প্রান্তে আসতে আসতে এর গতিও অনেক কমে যাওয়ার সম্ভাবনা।

চিত্র-কঃ এপ্রিল ১১, ২০১২ ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রায় সৃষ্ট ৮.৬ মাত্রার ভূমিকম্পের এপিসেন্টার ও ফল্টলাইনের অবস্থান (সূত্রঃ ইউএসজিএস)
এছাড়া সুনামির ক্ষেত্রে যে স্থানে ভূমিকম্প হয়েছে সেখানে ফল্ট (চ্যুতি) লাইনের প্রেক্ষিতে ভৌগলিক অবস্থানেরও একটা বিশাল ভূমিকা রয়েছে। সাধারণত ফল্টলাইন যে বরাবর থাকে কম্পন তার বিপরীত দিকে বৃত্তাকারে ছড়িয়ে পড়ে। ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে যে ভয়াবহ সুনামি হয়েছিলো তার ভূ-কম্পনের ফল্টলাইন উত্তর-দক্ষিণ বরারর থাকায় এর কম্পন ছড়িয়ে পড়েছিল এপিসেন্টার থেকে লম্ব অর্থাৎ পশ্চিম বরাবর। ফলে পশ্চিমে অবস্থিত শ্রীলংকাসহ অনেক দূরে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশকে আঘাত হানলেও বাংলাদেশ উত্তরে ফল্টলাইন বরাবর অবস্থান করায় এবং মহিসোপান অনেক দূর বিস্তৃত থাকায় আঘাত তেমন টের পাওয়া যায় নি। গতকাল (১১ই এপ্রিল) সুমাত্রায় যে ভূমিকম্প হয়েছে সেটাও ঠিক কাছাকাছি জায়গায় এবং একই ফল্টলাইন বরাবর (চিত্র-ক)। এ ক্ষেত্রে সুনামি সৃষ্টি হলেও তা থেকে বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা ছিলো কম। কাজেই সুনামির ক্ষেত্রে আতংকিত না হয়ে বা প্যানিক না ছড়িয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তারপর সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।
সুনামির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য আতংকজনক তেমন কিছু না থাকলেও ঘনবসতিপূর্ণ এদেশে বড় কোনো ভূমিকম্প যে বিশাল দুর্যোগ বয়ে নিয়ে আসবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শিরোনামে প্রস্তুতি ও করণীয় বলতে এখানে মূলত ভূমিকম্পে ব্যক্তিগত প্রস্তুতির কথাই তুলে ধরা হয়েছে। প্রচারণা, উদ্ধার ও পুনর্বাসন কাজে রাষ্ট্র এবং নগর কর্তৃপক্ষগুলোর প্রস্তুতি ও ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভূমিকম্পের সাথে অন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলির মধ্যে একটি বড় পার্থক্য হচ্ছে এটি খুব কম সময়ে কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই সম্পন্ন হয়। ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেবার মতো কোনো উপযুক্ত পন্থা বা প্রযুক্তি এখনও আবিষ্কৃত হয় নি। ভূমিকম্প বিষয়ে তাই সবার ব্যক্তিগত পূর্বপ্রস্তুতি ও এ সময়ে করণীয় সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরী।
ভূমিকম্প ঝুঁকি
নিজ এলাকার ভূমিকম্প ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা রাখাও প্রস্তুতির একটা অংশ। ভূমিকম্প ঝুঁকি অনুযায়ী ভূ-তাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশকে তিনটি প্রধান অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। সিলেট বিভাগসহ নেত্রকোনা, শেরপুর, কুড়িগ্রাম জেলা এবং ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, জামালপুর, গাইবান্ধা, রংপুর ও লালমনিরহাট জেলার অংশবিশেষ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মধ্যে রয়েছে। ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ইত্যাদি জেলা মাঝারি ঝুঁকিপ্রবণ এলাকায় পড়েছে। (চিত্র-ক)

চিত্র-কঃ ভূমিকম্প ঝুঁকি অঞ্চল (সূত্রঃ উইকিপিডিয়া)
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সর্বশেষ সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছিল ১৯১৮ সালে তৎকালীন শ্রীমঙ্গল বা সিলেট অঞ্চলে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৭.৬। এছাড়া, ১৮৯৭ এবং ১৯৫০ সালে আসামে যে দু’টো বিশাল ভূমিকম্প হয়েছিল, তা ছিল সিলেট সীমান্ত থেকে খুব কাছেই। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের খুব কাছে ডাউকি ফল্ট (চিত্র-খ) এবং ইউরেশিয়া-ইন্ডিয়ান প্লেটের সংযোগস্থলের অবস্থান হওয়ায় এ অঞ্চল ভূমিকম্পের জন্য খুব ঝুঁকিপূর্ণ।

চিত্র-খঃ বিভিন্ন এলাকায় সম্ভাব্য ভূমিকম্প মাত্রা (সূত্রঃ বাংলাপিডিয়া)
ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহর ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত হলেও বিশেষ করে ঢাকায় অপরিকল্পিত নগরায়ন, নাজুক দালান-কোঠা এবং অত্যধিক জনসংখ্যা ভূমিকম্পে ক্ষয়-ক্ষতির সংখ্যা অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে। ১৮৮৫ সালে ঢাকার কাছে মানিকগঞ্জে বিশাল এক ভূমিকম্প হয়েছিল (আনুমানিক ৭ থেকে ৮ মাত্রার) যা ইতিহাসে ‘বেঙ্গল আর্থকোয়েক’ নামে পরিচিত। এখন যদি ঢাকায় এ ধরনের কোনো ভূমিকম্প হয়, তবে অবস্থা কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। চট্টগ্রামেও ১৭৬২ সালে চট্টগ্রাম-আরাকান সীমান্তে একটি বড় ভূমিকম্প হয়েছিলো। সাম্প্রতিককালে, চট্টগ্রামে ১৯৯৭ সালে ৬.১ মাত্রার ভূমিকম্পে ২৩ জন লোক নিহত হয়েছিল।
ভূমিকম্পের ফলে ক্ষয়ক্ষতির তীব্রতার যে মাত্রা রয়েছে সে সূচক অনুযায়ী ঢাকা পৃথিবীর শীর্ষ ২০ টি ঝুঁকিপূর্ণ শহরের অন্যতম। ভূমিকম্প ঝুঁকি অনুযায়ী ঢাকাকে চারটি এলাকায় ভাগ করা যায় (চিত্র-গ)। ম্যাপে দেখা যাচ্ছে উত্তরা এলাকা সবচেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং খিলগাঁও, বাড্ডা, গুলশান, ক্যান্টনমেন্ট এবং পুরনো ঢাকার বুড়িগঙ্গা সংলগ্ন অঞ্চল বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় রয়েছে।

চিত্র-গঃ ঢাকার ভূমিকম্প ঝুঁকি এলাকা (সূত্রঃ ডেইলি স্টার)
ভূমিকম্পের সময় আসলে কতটুকু সময় পাওয়া যায়?
ভূমিকম্পের সময় প্রথম যে কম্পন টের পাওয়া যায় তা হলো প্রাইমারি ওয়েভ বা P-wave. এর গতিবেগ ১-১৪ কিমি/সে পর্যন্ত হতে পারে। এরপর আসে সেকেন্ডারি ওয়েভ বা Shear wave যার গতিবেগ ১-৮ কিমি/সে। এ দু’টো বডি ওয়েভ (চিত্র-ঘ)। এছাড়া লাভ এবং রেলেই নামে আরো দু’টো ওয়েভ আছে যেগুলো সারফেস ওয়েভ এবং তুলনামূলকভাবে শ্লথগতিসম্পন্ন।

চিত্র-ঘঃ ভূমিকম্পের সময় অনুভূত বিভিন্ন প্রকারের ওয়েভ
আমরা ভূমিকম্পে যে ঘরবাড়ি, অবকাঠামো ধ্বংস হতে দেখি তার জন্য মূলত দায়ী সেকেন্ডারি ওয়েভ এবং সারফেস ওয়েভগুলো- কারণ, এগুলোই সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী। এখন প্রাথমিক ভূ-কম্পন বা P-wave টের পাবার কতো সময় পর বাকিগুলো টের পাবেন? উত্তর হচ্ছে ব্যবধান খুব সামান্য। ধরুন আপনার অবস্থান ভূমিকম্পের এপিসেন্টার বা উৎপত্তিস্থল থেকে ২০০ কিমি দূরে। সেকেন্ডে যদি ১৪ কিমি বেগে P-wave আসে তবে ২০০ কিমি অতিক্রম করতে সময় নেবে প্রায় ১৪ সেকেন্ড। আর এরপর ৮ কিমি/সে বেগে সেকেন্ডারি ওয়েভ আসতে সময় নেবে প্রায় ২৫ সেকেন্ড। অর্থাৎ আপনি ভূমিকম্প টের পাবার মোটামুটি ১১ সেকেন্ডের ব্যবধানে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়ে যাবে। এর মধ্যেই আপনাকে আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রস্তুতি
• আপনি যদি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় থাকেন তবে খোঁজ নিন আপনার ভবনটিতে ভূমিকম্পরোধক ব্যবস্থা আছে কিনা, থাকলে তা কী মাত্রার ভূমিকম্প সহ্য করতে পারবে। যদি না থাকে তবে রেট্রোফিটিং-এর ব্যবস্থা নিন। কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পুরনো ভবনেও রেট্রোফিটিং-এর ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। জাপানে ভূমিকম্প একটি নৈমিত্তিক ঘটনা। কিন্তু তাদের ভবনগুলিতে ভূমিকম্পরোধক ব্যবস্থা থাকায় তাদের ক্ষয়ক্ষতি হয় অতি সামান্য।
• পরিবারের সবার সাথে বসে এ ধরনের জরুরী অবস্থায় কি করতে হবে, কোথায় আশ্রয় নিতে হবে- মোট কথা আপনার পরিবারের ইমার্জেন্সি প্ল্যান ঠিক করে সব সদস্যদের জানিয়ে রাখুন। ভূমিকম্পের সময় হাতে খুব সামান্যই সময় পাওয়া যাবে। এ সময় কী করবেন তা সবাইকে নিয়ে আগেই ঠিক করে রাখুন।
• বড় বড় এবং লম্বা ফার্নিচারগুলোকে যেমন- শেলফ ইত্যাদি দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখুন যেন কম্পনের সময় গায়ের উপর পড়ে না যায়। আর টিভি, ক্যাসেট প্লেয়ার ইতাদি ভারী জিনিষগুলো মাটিতে নামিয়ে রাখুন।
• বিছানার পাশে সবসময় টর্চলাইট, ব্যাটারী এবং জুতো রাখুন।
• বছরে একবার করে হলেও ঘরের সবাই মিলে আসল ভূমিকম্পের সময় কী করবেন তার একটা ট্রায়াল দিন।
ভূমিকম্পের সময় করণীয়
নিচের পরামর্শগুলো বেশি কার্যকরী যদি ভবনে ভূমিকম্পরোধক ব্যবস্থা থাকেঃ
১। ভূমিকম্পের সময় বেশি নড়াচড়া, বাইরে বের হবার চেষ্টা করা, জানালা দিয়ে লাফ দেবার চেষ্টা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা উচিত। একটা সাধারণ নিয়ম হল- এ সময় যত বেশি মুভমেন্ট করবেন, তত বেশি আহত হবার সম্ভাবনা থাকবে। আপনার ভবনে যদি ভূমিকম্পরোধক ব্যবস্থা থাকে বা রেট্রোফিটিং করা থাকে তবে ভূমিকম্পের সময় বাসায় থাকাই সবচেয়ে নিরাপদ।
২। আমেরিকান রেডক্রসের পরামর্শ অনুযায়ী- ভূমিকম্পের সময় সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল ‘ড্রপ-কাভার-হোল্ড অন’ বা ‘ডাক-কাভার’ পদ্ধতি। অর্থাৎ কম্পন শুরু হলে মেঝেতে বসে পড়ুন, তারপর কোন শক্ত টেবিল বা ডেস্কের নীচে ঢুকে কাভার নিন, এমন ডেস্ক বেছে নিন বা এমনভাবে কাভার নিন যেন প্রয়োজনে আপনি কাভারসহ মুভ করতে পারেন।
কোনো ভবন ভূমিকম্পরোধক হলে তা খুব কমই ধসে পড়ে; যেটা হয় তা হল আশেপাশের বিভিন্ন জিনিস বা ফার্নিচার গায়ের উপর পড়ে আহত হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই এগুলো থেকে বাঁচার জন্য এ সময় কোন শক্ত ডেস্ক বা টেবিলের নিচে ঢুকে আশ্রয় নেয়া জরুরী।
৩। ভূমিকম্পের সময় এলিভেটর/লিফট ব্যবহার পরিহার করুন।
৪। ভূমিকম্পের সময় যদি গাড়িতে থাকেন তবে গাড়ি বন্ধ করে ভেতরে বসে থাকুন। গাড়ির বাইরে থাকলে আহত হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
৫। ‘মেইন শক’ বা মূল ভূমিকম্পের আগে এবং পরে মৃদু থেকে মাঝারি আরো কিছু ভূমিকম্প হতে পারে যেগুলো ‘ফোরশক’ এবং ‘আফটার শক’ নামে পরিচিত। সতর্ক না থাকলে এগুলো থেকেও বড় বিপদ হয়ে যেতে পারে। সাধারণত কোনো বড় ভূমিকম্পে ‘আফটার শক’ প্রথম ঘণ্টার মধ্য থেকে শুরু করে কয়েক দিনের মধ্যে হতে পারে।
৬। প্রথম ভূমিকম্পের পর ইউটিলিটি লাইনগুলো (গ্যাস, বিদ্যুত ইত্যাদি) একনজর দেখে নিন। কোথাও কোন লিক বা ড্যামেজ দেখলে মেইন সুইচ বন্ধ করে দিন।
ধ্বংসস্তুপে আটকে পড়লে করণীয়
১। ধুলাবালি থেকে বাঁচার জন্য আগেই সাথে রুমাল বা তোয়ালে বা চাদরের ব্যবস্থা করে রাখুন।
২। ম্যাচ জ্বালাবেন না। দালান ধ্বসে পড়লে গ্যাস লিক হয়ে থাকতে পারে।
৩। চিৎকার করে ডাকাডাকি শেষ অপশন হিসেবে বিবেচনা করুন। কারণ, চিৎকারের সময় মুখে ক্ষতিকারক ধুলাবালি ঢুকে যেতে পারে। পাইপে বা ওয়ালে বাড়ি দিয়ে বা মুখে শিস বাজিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করতে পারেন। তবে ভাল হয় সাথে যদি একটা রেফারির বাঁশি বা হুইসেল থাকে, তার প্রিপারেশন নিয়ে রাখুন আগেই।
© তানভীর ইসলাম
বিডিনিউজ২৪-এ প্রকাশিতঃ লিংক
রাজউকের কর্তৃত্ব এবং আমাদের নগর পরিকল্পনা
বিডিনিউজের ৭ই মের খবরে দেখলাম রাজউক গুলশানে অবস্থিত শিশু-কিশোরদের বিনোদন পার্ক ‘ওয়ান্ডারল্যান্ড’ ভেঙে ফেলতে শুরু করছে। রাজউকের মেজিস্ট্রেট বিডিনিউজকে বলেছেন, “এটা রাজউকের জায়গা। সবার জন্য উন্মুক্ত শিশু পার্ক করার জন্য ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে বরাদ্দ দিয়েছিলো। কিন্তু এই নিয়ম না মেনে সিটি কর্পোরেশন বেসরকারিভাবে লিজ দেয়।”
ঢাকা শহরে নিয়ম বহিভূর্তভাবে যে অগণিত স্থাপনা রয়েছে এবং সুষ্ঠু নগর পরিকল্পনার স্বার্থে সেগুলো যে ভেঙে ফেলা প্রয়োজন তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এত এত অবৈধ ভবন-দালানকোঠা বাদ দিয়ে পার্কের মতো খোলা জায়গা যখন রাজউকের ভাঙচুরের তালিকায় অগ্রাধিকার পায়, তখন সেটা বেশ অবাক করার মতো ঘটনা বটে। ১৯৯০ সালে ওয়ান্ডারল্যান্ড কাজ শুরু করে এতদিন কীভাবে টিকে ছিলো সে প্রশ্নও আমাদের মনে আসে বৈকি। খবরে আরও যেটা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তা হলো- রাজউক জমি ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে লিজ দিয়েছিলো, সিটি কর্পোরেশন নিয়ম না মেনে বেসরকারীভাবে পার্ক করার জন্য লিজ দেয়ায় তারা তা ভেঙে ফেলতে শুরু করছে। অর্থাৎ এখানে রাজউকের কর্তৃত্ব ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের চেয়ে বেশি।
আমি নগর পরিকল্পনায় সামান্য পড়াশোনা এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ ও থাকার সুবাদে দেখেছি যে একটি শহরে নগর কর্তৃপক্ষের হাতেই সাধারণত নগর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ভার নিয়োজিত থাকে। সেখানে ঢাকা শহর (বাংলাদেশের অন্য বড় শহরগুলোরও প্রায় একই অবস্থা) একমাত্র ব্যতিক্রম। এখানে সিটি কর্পোরেশনের ওপর কর্তৃত্ব করে রাজউক! একটা শহরে নগর কর্তৃপক্ষকে সহায়তার জন্য রাজউকের মতো পরিকল্পনা ও উন্নয়ন সহযোগী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থাকতেই পারে। কিন্তু তাদের কাজগুলো হওয়া উচিত নগর কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় করে, তাদের পাশ কাটিয়ে নয় এবং তাদের কাজের জন্য নগর কর্তৃপক্ষের কাছেই দায়বদ্ধ হওয়া উচিত। রাজউকের মতো একই শহরে নগর কর্তৃপক্ষের প্যারালাল কোন নগর প্রতিষ্ঠান পৃথিবীর আর কোন শহরে আছে কিনা আমি জানি না।
টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট-১৯৫৩ এর যে ধারায় ডিআইটি বা রাজউক সৃষ্টি হয়েছিল, সেখানে ডিআইটিকে মূলত একটি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (development authority) হিসেবে গঠন করা হয়েছিল। ১৯৫৮ সালে আইন সংশোধন করে এর উপর পরিকল্পনার (planning) ভার ন্যস্ত করা হয়। কিন্তু সে অনুযায়ী এর প্রাতিষ্ঠানিক কোন পরিবর্তন আজও করা হয় নি! ফলে কোন প্রাতিষ্ঠানিক এবং কাঠামোগত সংস্কার ছাড়াই (পরিকল্পনার ক্ষেত্রে) ঢাকা মহানগরীর পরিকল্পনা প্রণয়ণ, উন্নয়ন এবং বিল্ডিং নিয়ন্ত্রণের জন্য রাজউক একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী সংস্থা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এতগুলো দায়িত্ব একসাথে নিলেও রাজউক তার আগের মূল দায়িত্ব অর্থাৎ ভূমি বা প্লট উন্নয়নের দিকেই বেশী মনোযোগী। ফলশ্রুতিতে রাজউক খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আমাদের এ পর্যন্ত যে সব মাস্টার প্ল্যান উপহার দিয়েছে তার সিকিভাগও বাস্তবায়ন হয় নি। পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দিকটি উপেক্ষা রেখে প্লট উন্নয়ন এবং বিল্ডিং নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে রাজউকের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ রয়েছে।
রাজঊক বা ডিআইটির সম্ভাব্য এ পরিণতির কথা উপলব্ধি করে স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে ‘ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি অর্ডিন্যান্স ১৯৭৪’ পাস করা হয়েছিল, যেখানে ডিআইটিকে সরিয়ে ‘কলকাতা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’র মত আরও অধিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষমতাসম্পন্ন সংস্থা গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্ত্ত রাজনৈতিক ডামাডোলে পড়ে এ অধ্যাদেশটি কালক্রমে বিলুপ্ত হয়ে যায়। ১৯৮১ সালে কনসালটেন্ট প্রতিষ্ঠান শাঙ্কল্যান্ড কক্স ‘ঢাকা ইন্টিগ্রেটেড প্ল্যান’-এর যে রিপোর্ট প্রকাশ করে তাতে ঢাকা মহানগরীর পরিকল্পনা ও উন্নয়নের জন্য দুটি পৃথক সংস্থা গঠনের সুপারিশ করা হয়। এর একটি ছিল ‘ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’, যা ডিআইটিকে সরিয়ে ভূমি উন্নয়ন এবং নিয়ন্ত্রণ করবে। অন্যটি ছিল ‘ঢাকা মেট্রোপলিটন প্ল্যানিং অথরিটি’- যার কাজ হবে পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, নাগরিক সুবিধা প্রদানকারী বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধন এবং ভূমি উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণের কাজ তদারকি করা। কিন্ত্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ রিপোর্ট কখনো গৃহীত হয় নি।
যে উদ্দেশ্য নিয়ে রাজউক গঠন করা হয়েছিল তা আজ মোটামুটিভাবে ব্যর্থ বলা যায়। এর সমাধানে ‘ঢাকা ইন্টিগ্রেটেড প্ল্যান’(১৯৮১)-এর রিপোর্টে ঢাকা মহানগরীর পরিকল্পনা (planning) ও উন্নয়নের (development) জন্য পৃথক দুটি কর্তৃপক্ষ গঠনের যে পরামর্শ দেয়া হয়েছে, তা বিবেচনা করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে নতুন আর কোন প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি না করে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে মহানগরীর পরিকল্পনা এবং রাজউককে সিটি কর্পোরেশনের তদারকিতে শুধু উন্নয়নের ভার দেয়া যেতে পারে। সিটি কর্পোরেশনগুলোর জনবল ও দক্ষতাও সেভাবে গড়ে তোলা প্রয়োজন।
© তানভীর ইসলাম
বিডিনিউজ২৪-এ প্রকাশিতঃ লিংক
ভ্রমণ/ফটোগ্রাফি প্রজেক্টঃ দ্য ডিগ্রি কনফ্লুয়েন্স
অনেকেই পারেন খুব সাধারণ জিনিস থেকে অসাধারণ কিছু আইডিয়া বের করে ফেলতে। ম্যাসাচুসেটসের বাসিন্দা এলেক্স জ্যারেট তেমন একজন মানুষ। জিপিএস বা গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম আমরা অনেকেই ব্যবহার করি- আমাদের গাড়িতে বা ফোন বা অনেকের ঘড়িতেই এই জিপিএস আছে। কিন্তু আমরা কেউ হয়তো এটা নিয়ে কখনো তেমন ভাবিনি। এলেক্সের হাতে ১৯৯৬ সালে যখন এই জিপিএস যন্ত্র এলো তখন তার মাথায় আসলো একে ভ্রমণের জন্য কীভাবে আরো বেশি কাজে লাগানো যায়। ছোটবেলা থেকে তার দুর্বলতা ছিলো অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ যেসব পূর্ণ সংখ্যা বা ডিগ্রিতে প্রকাশ করা হয় সেই সংখ্যাগুলোর ওপর যেমন- 43°00’00″N 72°00’00″W। তাই সে চিন্তা করলো জিপিএস ব্যবহার করে এই স্থানগুলো ভ্রমণ করলে নিশ্চয়ই দারুণ একটা ব্যাপার হবে।
যাদের অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ বিষয়ে তেমন ধারণা নেই, তাদের জন্য খুব সহজ ভাষায় এর ব্যাখা হলো- পৃথিবীর মাঝখানে উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধকে ভাগ করে পূর্ব-পশ্চিম বরাবর যে কাল্পনিক রেখা টানা হয় তার নাম নিরক্ষরেখা বা বিষুবরেখা (Equator)। এই বিষুবরেখার সমান্তরালে উভয় পাশে যে রেখাগুলো টানা হয় তার নাম অক্ষরেখা (line of latitude) । আবার গ্রিনিচ মানমন্দিরকে পৃথিবীর মাঝখান ধরে পূর্ব ও পশ্চিমকে ছেদকারী রেখার নাম মূল মধ্যরেখা (Prime meridian)। এই মধ্যরেখার উভয় পাশে সমান্তরাল কাল্পনিক রেখাগুলোর নাম দ্রাঘিমারেখা (line of longitude)। এই অক্ষরেখা ও দ্রাঘিমারেখাগুলো পরস্পরকে পৃথিবীর যে কোন স্থানে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে ছেদ করে। কোন স্থানের অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ হলো সেই বিন্দু থেকে বিষুবরেখা ও মূলমধ্যরেখার কৌণিক দূরত্ব।
সাধারণত পৃথিবীর কোন এলাকার অবস্থানকে অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশের ভিত্তিতে ডিগ্রি, মিনিট ও সেকেন্ডে প্রকাশ করা হয়। যেমন ঢাকার অবস্থান 23°42′0″N 90°22′30″E। পৃথিবীতে এমন অনেক স্থান আছে যেখানে এই অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশের মিনিট ও সেকেন্ডের সংখ্যা শূন্য অর্থাৎ এখানে অক্ষরেখা ও দ্রাঘিমারেখা যে বিন্দুতে ছেদ করে তাকে শুধু ডিগ্রিতে বা পূর্ণ সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করা যায়। যেমন উপরের চিত্রে A বিন্দুতে ২০ ডিগ্রি অক্ষরেখা (উত্তর) এবং ১২০ ডিগ্রি দ্রাঘিমারেখা (পশ্চিম) ছেদ করেছে। কাজেই A বিন্দুর অবস্থানকে শুধু ডিগ্রি বা পূর্ণ সংখ্যা দিয়েই প্রকাশ করা যাবে; এখানে মিনিট ও সেকেন্ডের কোন কারবার নেই। পৃথিবীর যে সব স্থান এসব সরল বা পূর্ণ সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করা যায়, এলেক্স সে সব স্থান ভ্রমণের একটি উদ্যোগ নিলেন। আর এভাবেই শুরু হলো দ্য ডিগ্রি কনফ্লুয়েন্স প্রজেক্ট।
দ্য ডিগ্রি কনফ্লুয়েন্স প্রজেক্ট
কনফ্লুয়েন্সের বাংলা ‘মোহনা’- যদিও এটি এখানে পূর্ণ সংখ্যার অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশের কাল্পনিক মোহনা, আরও নির্দিষ্ট করে বললে বলা যায় ‘ডিগ্রি মোহনা’। সারা পৃথিবীতে এরকম ৬৪,৪৪২টি ডিগ্রি মোহনা আছে অর্থাৎ ৬৪,৪৪২টি স্থানকে পূর্ণ সংখ্যায় বা শুধু ডিগ্রিতে প্রকাশ করা যায়। এদের মধ্যে ২১,৫৪৩টি স্থান স্থলভাগে, ৩৮,৪০৯টি জলভাগে এবং ৪,৪৯০টি স্থান মেরু অঞ্চলে পড়েছে। আপনি পৃথিবীর ঠিক যেখানেই থাকুন না কেনো, আপনার ৪৯ মাইলের (৭৯ কিমি) ভেতরেই একটি ডিগ্রি মোহনা আছে। তবে এই ডিগ্রি মোহনার বেশিরভাগ এলাকাই খুব দুর্গম অঞ্চলে পড়ায় ভ্রমণের জন্য মাত্র ১৬,৩৪৫টি ডিগ্রি মোহনা বাছাই করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রজেক্ট চালু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ৬,১৫৮টি ডিগ্রি মোহনা ভ্রমণ করা হয়েছে যা মোটামুটি বাংলাদেশসহ পৃথিবীর ১৮৫টি দেশে বিস্তৃত। দেশ অনু্যায়ী ডিগ্রি মোহনাগুলির একটি তালিকা প্রজেক্টের ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে।
এই প্রজেক্টের উদ্দেশ্য হলো সারা পৃথিবী জুড়ে নির্দিষ্ট এই স্থানগুলো পরিকল্পিতভাবে ভ্রমণ করা, ভ্রমণের বিবরণ ও ছবি তুলে আনা যাতে আমরা এই পৃথিবীকে আরো ভালোভাবে জানতে পারি। ভ্রমণের মাধ্যমে পৃথিবীর পরিবর্তনগুলো প্রত্যক্ষ করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য- কাজেই একই জায়গা একাধিক ভ্রমণ করাকেও এখানে উৎসাহিত করা হয়। সব ভ্রমণের বিবরণ ও ছবি প্রজেক্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। কাজেই আপনি যদি কোন ডিগ্রি মোহনা ভ্রমণ করতে ইচ্ছুক হোন, ভ্রমণের বিবরণ ও ছবি ওয়েবসাইটের যোগাযোগের ঠিকানায় অবশ্যই পাঠিয়ে দেবেন। ভ্রমণের জন্য আপনার প্রয়োজন হবে শুধু জিপিএস, ক্যামেরা ও দিক নির্ণয়ের জন্য একটি কম্পাস। জিপিএস যদি না থাকে, তবে ম্যাপে অবস্থান দেখে নিলেও চলবে- এক্ষেত্রে ম্যাপের ন্যূনতম স্কেল ১:২৫,০০০ হতে হবে। এছাড়া আপনাকে ডিগ্রি মোহনা বা নির্দিষ্ট বিন্দুর ১০০ মিটারের মধ্যে অবশ্যই থাকতে হবে, অন্যথায় ভ্রমণ বৃত্তান্ত ও ছবি প্রজেক্টের জন্য বিবেচিত হবে না।
প্রজেক্ট: বাংলাদেশ
বাংলাদেশের জন্য ১৫টি ডিগ্রি মোহনা বাছাই করা হয়েছে। এদের মধ্যে মাত্র ৪টি এখন পর্যন্ত ভ্রমণ করা হয়েছে (ছবিতে লাল রঙের চিহ্নিত বিন্দুগুলো) এবং দুর্ভাগ্যক্রমে চারটি স্থানই বিদেশীরা এসে ভ্রমণ করার কৃতিত্ব নিয়েছে। প্রথম যে মোহনাটি পরিদর্শিত হয় সেটি ঢাকার কাছে দেলুয়া চক নামক জায়গায় অবস্থিত। দুই অস্ট্রেলিয়ান বেঞ্জামিন উইলিয়ামস ও এন্ড্রু র্যানকিন ২০০৪ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি এটি পরিদর্শন করেন। বিবরণে তারা জানাচ্ছেন, অস্ট্রেলিয়ার সহজ জায়গাগুলো হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় তারা এই প্রজেক্টে অংশ নিতে বাংলাদেশে এসেছিলেন।
এরপর বেলজিয়ান কার্টুনিস্ট লুক নেত্রকোনায় অবস্থিত মোহনাটি পরিদর্শন করেন ১৭ই জুলাই, ২০০৪ সালে। নিজের নামানুসারে তিনি এই মোহনার নাম দিয়েছেন ‘লুক পয়েন্ট’ (আপনারা চাইলে কেউ আমার নামেও কোন পয়েন্টের নাম দিতে পারেন
)।
জার্মানির কার্ল লিপ্পে আরো কয়েকজনসহ নীলফামারি জেলায় অবস্থিত ডিগ্রি মোহনাটি ২৪ মার্চ, ২০০৬ সালে ভ্রমণ করেন এবং সর্বশেষ ইংল্যাণ্ডের ক্রোয়ার্ডস পরিবার ১৯শে মে ২০০৭ সালে ব্রাক্ষ্ণণবাড়িয়ার কাছে ডিগ্রি মোহনাটি পরিদর্শন করে এর বিবরণ লিপিবদ্ধ করে।
বাংলাদেশের ডিগ্রি মোহনাগুলোর একটি তালিকা এখানে পাওয়া যাবে। আমাদের ফটোগ্রাফার এবং ভ্রমণপিয়াসীদের জন্য এই মোহনাগুলো ভ্রমণ কিংবা ছবি তোলার জন্য আর্দশ স্থান হতে পারে। এছাড়া বিদেশিরা এসে আমাদের বাকি মোহনাগুলো ভ্রমণের কৃতিত্ব নিয়ে নেওয়ার আগে সেটা দেশের মানুষদেরই করা প্রয়োজন।
© তানভীর ইসলাম
বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাস, সতর্কীকরণ এবং সরকারের উদাসীনতা
বাংলাদেশে বরাবরের মতো এ বছরও ব্যাপক বন্যা হয়েছে এবং হচ্ছে। খবরে দেখলাম প্রচুর লোক হতাহত এবং ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। দেশের কৃষি ও অর্থনীতিও বন্যার ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। আধুনিক যুগে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনেক অগ্রগতি হয়েছে। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি দুর্যোগের পূর্বাভাসও এখন আগে থেকে দিয়ে দেয়া যায়। বাংলাদেশে আমরা দীর্ঘকাল বন্যার সাথে বসবাস করে আসলেও বাংলাদেশ সরকার বন্যার পূর্বাভাস দেয়া শুরু করেছে মোটামুটি নব্বইয়ের দশক থেকে। ১৯৮৮ সালে দেশ জুড়ে প্রলয়ংকরী বন্যার কথা আমাদের সবারই মনে থাকার কথা। মূলত ৮৮’র বন্যার ভয়ংকর অভিজ্ঞতার পর সরকার বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠীর সহায়তায় ফ্ল্যাড একশন প্ল্যান (FAP) হাতে নেয়। এই FAP-এর আওতায় ১৯৯২ সালে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফ্লাড ফোরকাস্টিং ওয়ার্নিং সেন্টার (FFWC) বা বন্যা পূর্বাভাস সতর্কীকরণ কেন্দ্র যাত্রা শুরু করে। ড্যানিশ হাইড্রোলজিক্যাল ইন্সটিটিউটের (DHI) সহায়তায় বন্যা পূর্বাভাসের জন্য Mike 11 River Routing Model এবং শুরুতে মাত্র ১০টি রিয়েল টাইম বা তাৎক্ষণিক ফ্লাড মনিটরিং স্টেশন দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও এখন তাদের স্টেশনের সংখ্যা ৬৭টি।
ফ্লাড ফোরকাস্টিং ওয়ার্নিং সেন্টার মূলত এই রিয়েল টাইম মনিটরিং স্টেশনগুলোর ডেটা এবং তাদের Mike 11 হাইড্রোলজিকাল মডেলের ভিত্তিতে (এর সাথে বৃষ্টিপাত, টপোগ্রাফি ইত্যাদি যোগ করে একটা মডেল বানিয়ে তারা ‘সুপার মডেল’ নাম দিয়েছে) তাদের পূর্বাভাস দেয়। এই বন্যার পূর্বাভাস তাদের বক্তব্য অনুযায়ী ৩ দিনের বেশি আগে দেয়া সম্ভব নয়।
Today it is not possible to forecast the flood level in Bangladesh more than 3 days ahead.
আমি FFWC-এর উদ্যোগের যেটা প্রশংসা করি তা হলো তারা পূর্বাভাসের সাথে তাদের ডেটা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রেখেছে যেটা বাংলাদেশ সরকারের অন্যান্য এজেন্সির মধ্যে বেশ দুর্লভ। বাংলাদেশের কোন সরকারি মন্ত্রণালয় বা বিভাগের কাছে ডেটা সংগ্রহের অভিজ্ঞতা যাদের আছে তারা জানেন যে তাদের কাছে কোন কিছু চাওয়া যেন কোন অপরাধের ব্যাপার অথবা আপনি যেন কোন সাত রাজার ধন তাদের কাছে দাবী করে বসেছেন! অথচ পাবলিক এজেন্সির ডেটা পাবলিকের কাছেই উন্মুক্ত হওয়ার কথা। সে দৃষ্টিকোণ থেকে আমি FFWC-এর কার্যক্রমের প্রশংসাই করতে চাই।
কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো FFWC ১৯৯২ সালে যে পদ্ধতিতে বন্যার পূর্বাভাস দিতো আজ ২০বছর পরেও সেই একই পদ্ধতিতে তাদের পূর্বাভাস দেয়। অথচ এই বিশ বছরে পৃথিবীতে বন্যা পূর্বাভাস পদ্ধতি এগিয়ে গেছে অনেকখানি। তিনদিনের ব্যবধানে বন্যার পূর্বাভাস বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য রিয়েল টাইম বন্যার মতোই। বন্যা শুরু হলেই কেবল মানুষ টের পায়, পূর্বাভাস আর পৌঁছায় না- প্রস্তুতি নেয়ার সময়ও পাওয়া যায় না। সরকারেরও এ বিষয়ে কোন প্রস্তুতি চোখে পড়ে না।
বন্যা পূর্বাভাসের নতুন পদ্ধতির কথা বলছিলাম। তার আগে একটু আবহাওয়া বিজ্ঞান নিয়ে বলি। বিজ্ঞানের সাম্প্রতিকতম শাখাগুলির মধ্যে আবহাওয়া বিজ্ঞান অন্যতম। গত কয়েক দশকে এর অগ্রগতি হয়েছে অবিশ্বাস্যরকম। এই কিছুদিন আগেও কিন্তু মানুষ ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস দিতে পারত না। ১৯৭০ সালে বাংলাদেশের যে প্রায় তিন লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছিলো তারা কিন্তু সামান্য আগেও ঘুণাক্ষরে টের পায় নি কী ভয়ংকর ঝড়ের মুখোমুখি তারা হতে যাচ্ছে। পূর্বাভাসের কোন সিস্টেম এই দেশে চালু ছিলো না। তারও আগে আমেরিকার আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাসের জন্য কিউবার বিজ্ঞানীদের ওপর ভরসা করতো, কারণ তাদের হিসাব-নিকাশ আমেরিকার বিজ্ঞানীদের চেয়ে নির্ভুল হতো। আবহাওয়া বিজ্ঞানের জয়যাত্রা সূচিত হয়েছে মোটামুটি স্যাটেলাইট, রাডার এগুলো আবিষ্কারের পরে। যুগান্তকারী সব থিওরি, মডেলও এসেছে এর পরে। আবহাওয়া বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে এখন লং রেইঞ্জে বা দীর্ঘ মেয়াদে বন্যার পূর্বাভাস দেয়া সম্ভব।
বাংলাদেশের জন্য এমন একটি ক্লাইমেট ফোরকাস্ট এপ্লিকেশন তৈরি করেছিলেন জর্জিয়া টেকের আবহাওয়া বিজ্ঞানের অধ্যাপক পিটার ওয়েবস্টার এবং তার সঙ্গীরা। পিটার ওয়েবস্টার সাম্প্রতিক সময়ে বেশ আলোচিত ক্লাইমেট চেইঞ্জ বা জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে তার গবেষণা ও সরব ভূমিকার জন্য। সায়েন্সে প্রকাশিত তার এ প্রবন্ধে তিনি দেখান যে বর্তমানে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যাবৃদ্ধির সাথে তাপমাত্রা বৃদ্ধি বা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সম্পর্ক রয়েছে। যারা একটু খোঁজ-খবর রাখেন তারা জানেন যে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে কোন ঐকমত্য নেই। এদের এক পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন উইলিয়াম গ্রে ও তার শিষ্যরা। আমেরিকান সরকারও যেহেতু অফিশিয়ালি জলবায়ু পরিবর্তন স্বীকার করে না, তারা এই গ্রুপটাকে সমর্থন করে (ওবামা আসার পর অবশ্য এই মনোভাবের পরিবর্তন হয়েছে)। অন্য গ্রুপের নেতৃত্বে আছেন এই পিটার ওয়েবস্টার, গ্রেগ হল্যান্ড, জুডি কারি, কেরি ইমানুয়েল প্রমুখ। ক্লাইমেট চেইঞ্জ বিষয়ক একটা রিসার্চ প্রপোজালে জুডি কারি, পিটার ওয়েবস্টারদের সাথে একসময় আমার কিছুদিন কাজ করার সুযোগ হয়েছিলো, তবে ফান্ড না পাওয়ায় সে প্রজেক্ট আর আলোর মুখ দেখে নি।
যাহোক, পিটার ওয়েবস্টার বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাসের জন্য যে ক্লাইমেট ফোরকাস্ট মডেল তৈরি করেছিলেন তা তাদের ভাষ্যমতে তিন ধরনের পূর্বাভাস দিতে পারে- ক) স্বল্প মেয়াদেঃ ১-১০ দিন খ) মধ্যম মেয়াদেঃ ২০-২৫ দিন এবং গ) দীর্ঘ মেয়াদেঃ ১-৬ মাস। দীর্ঘ মেয়াদের পূর্বাভাস নিয়ে কাজ কতদূর হয়েছে আমি জানি না, তবে বাংলাদেশের বর্তমানের ৩ দিনের পূর্বাভাসকে যদি ৬ মাসে নিয়ে যাওয়া যায় এবং সে অনুযায়ী বন্যার জন্য আগে থেকে প্রস্তুতি নেয়া যায়, তাহলে সেটা দেশের জন্য যে একটা চমৎকার ব্যাপার হবে এবং এখনকার মত ক্ষয়ক্ষতির স্বীকার হতে হবে না, তা নিঃসন্দেহে বলে দেয়া যায়। পিটার তার এই প্রজেক্ট ১৯৯৮ সালে শুরু করেন এবং এই ১৩-১৪ বছরে সেটা পুরোদমে দাঁড়িয়ে যাবার কথা।
সাধারণত গবেষকরা কোন প্রজেক্টে ফান্ড পেয়ে গেলে সেখান থেকে কিছু পাবলিকেশন্স বা পেপার বের হলেই তারা খুশি থাকেন। পিটার ওয়েবস্টারের এই বাংলাদেশ প্রজেক্টে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউণ্ডেশন, কেয়ার এবং ইউএস-এইড অর্থ সহায়তা করেছিলো। কিন্তু পিটার যে এই প্রজেক্টের ব্যাপারে বেশ আন্তরিক ছিলেন তা বোঝা যায় পার্টনারের তালিকায় বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন এজেন্সির নাম দেখে- যাদের একসাথে যোগাড় করা আসলে কোন সহজ ব্যাপার নয় এবং এদের মধ্যে বাংলাদেশ আবহাওয়া বিভাগসহ ৩ দিনের পূর্বাভাস দেয়া ফ্লাড ফোরকাস্টিং সেন্টারও আছে। যতদূর শুনেছি এই প্রজেক্ট চালু হওয়ার পর এশিয়ান ডিজাস্টার প্রিপেয়ার্ডনেস সেন্টার এতে আগ্রহ প্রকাশ করে এবং তাদের মাধ্যমেই বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এতে যুক্ত হয় এবং তাদের ট্রেনিং দেয়া হয়। তাদের লক্ষ্য ছিলো সরকারের কাছে এর প্রযুক্তি হস্তান্তর করা যেন বাংলাদেশ নিজেই একসময় দীর্ঘমেয়াদী বন্যার পূর্বাভাস দিতে সক্ষম হয়। বিক্ষিপ্তভাবে যে সরকার এদের পূর্বাভাস ব্যবহার করেছে তা ভয়েস অফ আমেরিকায় পিটার ওয়েবস্টারের সাক্ষাৎকারে প্রতীয়মান হয় এবং সাক্ষাৎকারে পিটার বাংলাদেশের প্রশংসাই করেছিলো। কিন্তু তারপরও এখনো সরকারী ফ্লাড ফোরকাস্টিং ওয়ার্নিং সেন্টারের ২০ বছর আগের মডেল ব্যবহার করে মাত্র ৩ দিনের পূর্বাভাস দেয়া এবং বছর বছর বন্যায় সরকারের অপ্রস্তুতির কী কারণ তা বোধগম্য নয়। বাংলাদেশে একবার বিশাল বন্যাচলাকালীন সময়ে পিটার ওয়েবস্টারের সাথে এক কনফারেন্সে দেখা হয়েছিলো। তখন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তারা সময়মতো বাংলাদেশ সরকারকে পূর্বাভাস জানিয়েছিলো কিনা। সে বললো, তারা সময়মতো ঠিকই পূর্বাভাস দিয়েছিলো, কিন্তু সরকারের এ বিষয়ে কোন মাথাব্যথা নেই।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গতকাল বলেছেন বন্যা খুবই উপকারি এবং বন্যার ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সরকারের নজর রয়েছে। খুবই ভালো কথা। কিন্তু বন্যা কেমন উপকারী তা যারা ভুক্তভোগী তারাই শুধু হাড়ে হাড়ে টের পায় এবং বন্যা বা যে কোন দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সরকারের শুধু নজর ছাড়াও আরো বেশি কিছু করা প্রয়োজন। আমাদের দেশে মানুষ এখনো যেভাবে মরে তাতে মনে হয় যে আমরা এখনো আদিম পৃথিবীতে বসবাস করি। অথচ প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে এগুলোকে ঠেকানো যায় এবং বাংলাদেশের জন্য প্রযুক্তি যে দুর্লভ বা ব্যয়বহুল তাও নয়। এ প্রসঙ্গে টর্নেডোর পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ নিয়েও একটু বলতে চাই। বাংলাদেশে এখনো টর্নেডোর পূর্বাভাস দেয়া হয় না। প্রতি বছর এপ্রিল-মে মাসে টর্নেডোতে এবং কালবৈশাখি ঝড়ে লঞ্চডুবিতে প্রচুর মানুষ মারা যায়। অথচ সরকার একটু সচেতন হলে এই অপমৃত্যুর হাত থেকে মানুষকে বাঁচানো যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিসের আবহাওয়াবিদ জোনাথন ফিঞ্চ তার এই সাইট থেকে প্রতি বছর বাংলাদেশের টর্নেডো মৌসুমে পূর্বাভাস দিতেন। মূলত ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগের রেডার ডেটা যোগাড় করে তিনি এই কাজ করতেন। আমরা বাংলাদেশ আবহাওয়া বিভাগের সাথে যোগাযোগ করে ফিঞ্চের সহায়তায় টর্নেডো পূর্বাভাস দেয়া যায় কিনা সে চেষ্টা করেছিলাম। কেউ সাড়া দেয় নি। জোনাথন ফিঞ্চ ২০০৮ সালের পর তার সাইটে আর কোন পূর্বাভাস দেয় নি। আমি জানি পিটার ওয়েবস্টারের মতো সেও ক্ষুব্ধ। আর ঘরের খেয়ে কেই বা এত বনের মোষ তাড়ায়, যাদের মাথাব্যথা হওয়া প্রয়োজন তাদেরই যদি কোন ভ্রূক্ষেপ না থাকে?
© তানভীর ইসলাম
রেকর্ডস
আজকাল ইন্টারনেটের সুবাদে গান শোনা অনেক সহজলভ্য হয়ে গেছে, তা সে বাংলা, ইংরেজী, হিন্দি যে গানই হোক না কেন। অথচ একসময় কি কষ্ট করেই না ইংরেজি গান সংগ্রহ করতাম। তখন ছিল লং প্লে বা এলপির যুগ। সিডি যদিও কিছুদিন পরেই এসেছে কিন্তু প্রথমদিকে সিডি/সিডি প্লেয়ার এসবের দামও ছিল আকাশ ছোঁয়া। আমাদের মত গরীবস্য মানুষেরা যাদের এলপি/সিডি কোনটাই পোষার সামর্থ্য ছিল না, তখন এলপি/সিডি থেকে অডিও ক্যাসেটে গান সংগ্রহ করে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতাম।
আমার ঘাড়ে ইংরেজী গানের ভূত চাপাটা ছিল একটু অস্বাভাবিক। আব্বা চট্টগ্রাম বেতারে একসময় নিয়মিত রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন। আর সব রবীন্দ্রপ্রেমীর মত তাঁরও ছিল রবীন্দ্রসংগীতের বিশাল কালেকশন। ওনার কাছ থেকেই দেখেছি কি যত্ন করে উনি রেকর্ডিং করতেন। বাজারে যে সব রবীন্দ্রসংগীতের এলবাম পাওয়া যেত সেগুলোতে নিম্নমানের ক্যাসেট ব্যবহার করা হত বলে কখনো কিনতেন না; সবসময় নামকরা রেকর্ডিং স্টুডিও থেকে ভাল মানের ক্যাসেটে গান সংগ্রহ করতেন। বাসায় এমন রাবীন্দ্রিক আবহ, তাও এহেন আলেম-এর ঘরে আমি জালেম হয়ে গেলাম। রবীন্দ্র সংগীতের পথে আর পা মাড়ালাম না।
আমার প্রথম শোনা ইংরেজী গান সুইডিশ পপ গ্রুপ ‘এবা’-র একটা মিক্সড এলবাম। এটাও আব্বার রেকর্ডিং করা। ওই একটা ইংরেজী ক্যাসেট-ই বাসায় ছিল তখন। কি মনে করে যে তিনি এটা রেকর্ডিং করেছিলেন, তা জানি না। অবশ্য ‘এবা’, ‘বনি এম’- এই টাইপের ব্যান্ডগুলো তখন বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয় ছিল। বিটিভি-তে ‘সলিড গোল্ড’ নামের একটা ইংরেজী গানের অনুষ্ঠানে এসব ব্যান্ডের গান মাঝে মাঝে দেখতাম। যদিও ‘বনি এম’-এর ওই বানর সদৃশ লোকটার লম্ফ-ঝম্প দেখতে খুবই বিরক্ত লাগত।
ইংরেজী গান আমার প্রথম ভাল লাগা শুরু হল মনে হয় ক্লাস সেভেনে। এক বন্ধুর হাত ঘুরে তার মামার রেকর্ডিং করা একটা ক্যাসেট এল আমার কাছে। অনেক নতুন নতুন শিল্পী আর ব্যান্ডের গান শুনলাম তখন- রিচার্ড মার্ক্স, এলান পারসন্স প্রজেক্ট, কুল এন্ড দ্য গ্যাং, ফরেনার ইত্যাদি। এতদিন যে সব ইংরেজি গান শুনতাম বা বিটিভিতে দেখতাম তার চাইতে এগুলো ছিল একদম অন্যরকম। বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম, তোর মামা এটা কোথেকে রেকর্ডিং করেছে? সে খোঁজ করে জানাল- ‘রেকর্ডস’। সেই থেকে আমার রেকর্ডসে আনাগোনা শুরু হল।
তখন চট্টগ্রামে ওই একটাই ইংরেজী গানের রেকর্ডিং স্টুডিও ছিল। চট্টগ্রাম মেডিকেল ফেলে সামনে যেতে আলমাস সিনেমা হলের কাছাকাছি মেহেদিবাগ এলাকায় দোকানটা ছিল (মনে হয় এখনো আছে)। ড্রাগ এডিক্টদের মত আমারও নেশা হয়ে গেল ‘রেকর্ডস’-এ যাওয়া আর গান রেকর্ডিং করা। কিন্তু বাধ সাধল টাকা। একটা ৬০ মিনিটের ক্যাসেট রেকর্ডিং করতে ৯০ টাকা লাগে, আর ৯০ মিনিটের জন্য ১২০ টাকা। এত টাকা কোথায় পাব? বাসায় যদি বলি ইংরেজী গান রেকর্ডিং করব, টাকা দাও; ভাববে পড়াশোনা বাদ দিয়ে বখে যাওয়ার রাস্তা খুঁজছি। বুদ্ধি একটা পেয়ে গেলাম। তখন চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে যাওয়া শুরু করেছি। বাসা থেকে অনেক দূর, দশ টাকা রিক্সা ভাড়া লাগে, আসা-যাওয়া বিশ টাকা। সে সময় দশ টাকা দিয়ে পুরো চিটাগাং শহর ঘুরে আসা যেত। ঠিক করলাম, বাসা থেকে রিক্সার টাকা নিয়ে বাস বা টেম্পোতে যাতায়াত করব। অনেক টাকা বাঁচানো যাবে। শখের জন্য না হয় একটু ত্যাগই স্বীকার করলাম!
টেম্পোর কথা প্রসঙ্গে একটা মজার ঘটনা মনে পড়ে গেল। তখন সকালে স্যারের কাছে ব্যাচে পড়ি। ব্যাচে গার্লস স্কুলের মেয়েরাও একসাথে পড়ত। স্যারের কাছে পড়ার চেয়ে আমাদের ওই আকর্ষণই বেশী। একতরফা প্রেমে পড়ে মাঝে মাঝে কার কি করূণ দশা হচ্ছে এটা নিয়েও আমরা মজা করতাম। একদিন এক বন্ধু তার টেম্পোতে চড়ার করুণ কাহিনী বর্ণণা করল। ব্যাচেরই এক মেয়েকে সে পছন্দ করত মনে মনে। একদিন স্কুলে যাওয়ার সময় টেম্পোর ভিতরে জায়গা না পেয়ে সে বাইরে হেলপার-এর সাথে ঝুলে ঝুলে আসছিল। হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে পেল পেছনের যে দামী গাড়ীটা এতক্ষণ টেম্পোর পেছন পেছন আসছিল, তাতে তার পছন্দের মেয়ে বসে আছে। সারাদিন সে খুবই মন খারাপ করে রইল। আর কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেয়ার মত এরপর থেকে আমরা এটা নিয়ে তার সাথে মজা করতে লাগলাম!
রেকর্ডসের কথায় ফিরে আসি। বিশ টাকা থেকে একটু একটু করে ক্যাসেট রেকর্ডিং-এর জন্য সেইভ করতে আমার মোটামুটি অনেক দিন লাগত। যখনই টাকাটা জমত দিতাম দৌড়। কিন্ত রেকর্ডসের সিরিয়াল এত লম্বা থাকত, আমার ক্যাসেট হাতে পেতে অনেক দিন অপেক্ষা করতে হত। প্রায়ই দেখা যেত, অর্ডার দেয়ার পর কাকুতি-মিনতি করছি, ভাইয়া আমার ডেট-টা একটু আগে দেন, আমি তো সবসময় আসি। মাঝে মাঝে দয়া-পরবশ হয়ে সিরিয়াল আগে করে দিত আর আমি বিশ্বজয়ের ভাব নিয়ে ফিরতাম। তখন গান-বাছাই করাটা ছিল এক বিরাট প্রব্লেম। এখন যেমন নতুন গান শুনে তারপর রেকর্ডিং করতে দেয়া যায়, তখন তো এমন ছিল না। মাঝে মাঝে বিচিত্রা বা ম্যাগাজিনগুলাতে বিলবোর্ড/ইউ কে/ইউএস টপ চার্ট দিত। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ম্যাগাজিন উল্টিয়ে গানের টাইটেলগুলো মুখস্থ করে আসতাম আর অন্ধের মত সেগুলোই দিতাম। তবে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে যাদের গান পছন্দ করি, তাদের কেউ যদি চার্টে আসত তখন শুধু দিতাম। গানের লিরিক যোগাড় করা ছিল আরেক ঝক্কি। বাংলা গানই লিরিক ছাড়া বোঝা যায় না, তায় আবার ইংরেজী গান। মাঝে মাঝে ইংরেজী লিরিকের ম্যগাজিন বের হত। বইয়ের দোকানে, ফুটপাতে খুঁজে ওগুলোই কিনতাম। এলপি/সিডি-র সাথে অনেক সময় গানের লিরিক দেয়া থাকত। রেকর্ডসে দিয়ে কান্নাকাটি করতাম, ভাইয়া লিরিকসের কাভারটা একটু দেন, ফটোকপি করে দিয়ে যাচ্ছি। তা চিটাগাং-এ যেহেতু একটাই দোকান ছিল, রেকর্ডস-এর লোকগুলা সে জন্যেই মনে হয় হেভী মুডে থাকত। ইচ্ছা হলে দিত, না হলে দিত না। আজ যখন গুগলে টিপ দিলেই লিরিক চলে আসে, তখন আমার সেই কান্না-কাটির দিনগুলোর কথা মনে হলে হাসিই পায়।
রেকর্ডস নিয়ে একটা দুঃখের স্মৃতিও আছে। রেকর্ডসে প্রায়ই একটা ফর্সামত ছেলেকে দেখতাম একমনে রেকর্ডিং করছে বা ক্যাসেটের কাভারে গানের টাইটেল গুলো লিখছে। মুক্তোর মত তার হাতের লেখা। আমার রেকর্ডিং করা অনেকগুলো ক্যাসেটেই তার হাতের লেখা আছে। চট্টগ্রাম কলেজে ক্লাস শুরু করার পর একদিন দেখি সে আমার পাশেই বসে আছে। ‘আরে, তুমি রেকর্ডস-এর না!’ সেও গলায় খুবই ভাব ফুটিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, আমি যাই ওখানে মাঝে মাঝে, ওখানকার ম্যাক্সিমাম টাইটেল আমার লেখা’। পরে তার কাছে জানলাম সে আসলে রেকর্ডসের মালিকদের কেউ না, একসময় সে ওখানে আমার মতই পয়সা দিয়ে গান রেকর্ডিং করতে যেত। তার হাতের লেখা দেখে ওরা তাকে টাইটেল গুলা লিখে দিতে বলেছে, বিনিময়ে ইচ্ছেমতো রেকর্ডিং ফ্রি! ছেলেটার নাম শ্রীকান্ত। শ্রীকান্ত রক্ষিত। আমেরিকায় আসার পর একদিন বিস্মিত হয়ে পত্রিকার ফ্রন্ট পেইজে আমি শ্রীকান্তের ছবি দেখলাম। আরে শ্রীকান্ত, এক্কেবারে ফ্রন্ট পেইজে! প্রথম বিস্ময়ের ধাক্কা কাটতে না কাটতেই হতভম্ব হয়ে হেডিং পড়লাম- ‘সন্ত্রাসীদের হাতে শ্রীকান্ত রক্ষিত নিহত’। শ্রীকান্তের বাবা মারা গিয়েছিল আগেই। জমি-জমা নিয়ে বোধহয় কিছু বিরোধ চলছিল, তার জের ধরেই এই খুন। এমন একটা গান-পাগল ছেলে যে শুধু গান শোনার লোভেই রেকর্ডিং স্টুডিওতে স্বেচ্ছাশ্রম দিত, তাকেও মানুষ খুন করে ফেলতে পারে- এটা কিভাবে সম্ভব হয়, আমি বুঝতে পারি না!
একসময় আমার রেকর্ডিং করা ক্যাসেটের সংগ্রহকেই মনে হত আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ! কত মায়া-মমতা, কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে ক্ষুদ্র এক একটা ক্যাসেটের পেছনে। এখানে আসার সময় সবার হাসি-ঠাট্টা উপেক্ষা করে অল্প কিছু ক্যাসেটও নিয়ে এসেছিলাম। এখন তো সিডি-ও শোনা হয় না। যা কিছু সব ইন্টারনেটেই শুনি। মাঝে মাঝে ক্যাসেটগুলোর ধুলো ঝেড়ে পরিষ্কার করি, শ্রীকান্তের হাতে লেখা টাইটেলগুলো নেড়েচেড়ে দেখি; আর স্মৃতির কোন এক অতল গহবর থেকে ফিরে ফিরে আসে আমার কৈশোর, আমার স্বর্ণালী দিনগুলো।
Those were such happy times
And not so long ago
How I wondered where they’d gone
But they’re back again
Just like a long lost friend
All the songs I loved so well.
© তানভীর ইসলাম | ছবিসূত্রঃ ইন্টারনেট
ঢাকার নগর পরিকল্পনাঃ সমস্যা ও সম্ভাবনা ০৫
শহরের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ, সিটি ম্যানেজার নিয়োগ ও সিস্টার সিটি কনসেপ্ট
নাগরিক সম্পৃক্ততা বা জনগণের অংশগ্রহণ (public participation) আধুনিক নগর পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও আমাদের দেশে বরাবরই তা উপেক্ষিত থেকেছে। যারা শহরের নাগরিক তাদের মতামতের কোন মূল্য ছাড়াই এখানে বিচ্ছিন্নভাবে পরিকল্পনা করা হয়। নগর পরিকল্পনায় নাগরিকদের সম্পৃক্ত করার সবচেয়ে বড় সুযোগ থাকে শহরের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য (Goals and objectives) নির্ধারণে এবং তার ভিত্তিতে বিভিন্ন পরিকল্পনা, মহাপরিকল্পনা (Master Plan) প্রণয়নে। ঢাকা শহরের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী- আমরা কেউ কি তা জানি? কোন পথে চলেছে আমাদের প্রিয় শহর? কোন গন্তব্যে?
একটা নগরকে মানুষের জীবনের সাথে তুলনা করা যায়। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যহীন মানুষ যেমন জীবনের টানাপোড়নে একসময় মুখ থুবড়ে পড়ে, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যহীন শহরও তাই। বর্তমান সময়ের জন্য এ কথাটা আরো বেশী করে সত্য। আমরা এখন একটা নতুন শতকের প্রারম্ভে দাঁড়িয়ে আছি। তথ্য প্রযুক্তির নিত্য নতুন আবিষ্কার, টেকসই উন্নয়ন ইত্যাদির প্রেক্ষাপটে একেবারেই ভিন্ন একটা শতক। এরকম একটি সময়ের মোকাবিলায় আধুনিক বিশ্বের একটা শহরের কী করণীয়, তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী হওয়া উচিত- এগুলো পৃথিবীর বেশীরভাগ শহর অনেক আগেই নির্ধারণ করে ফেলেছে। আমি কিছুদিন আগে টেক্সাসের যে ছোট্ট শহরে ছিলাম, সেই Lubbock শহরেরও একুশ শতকের মোকাবিলায় নিজস্ব লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য রয়েছে (পড়ুন Goals for Lubbock: A vision into the 21st Century)।
এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যগুলো কিন্ত্ত কোন বিশেষজ্ঞমহল নাগরিকদের উপর চাপিয়ে দেয় নি। রীতিমতো সাধারণ মানুষের উপর জরিপ চালিয়ে, তাদের মতামত নিয়ে তারপর নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে শহরের পরিবহন ব্যবস্থাপনা নিয়ে দিক নির্দেশনা যেমন আছে, তেমনি আছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, নান্দনিকতা- ইত্যাদি আনুষংগিক সব বিষয়ের উপর আলোকপাত। এর উপর ভিত্তি করেই এখন বিশেষজ্ঞরা নতুন পরিকল্পনা তৈরী করছেন, শহর বর্ধিষ্ণু ও সম্প্রসারিত হচ্ছে। প্রয়োজনে যে সব বিষয়ে অস্পষ্টতা আছে, সেখানে নতুন করে নাগরিক মতামত নেয়া হচ্ছে। এমনটাই তো স্বাভাবিক। মানুষের জন্যই নগর; তাই নগর পরিকল্পনা যদি নাগরিকদের আশা-আকাংখাকে প্রতিফলন না করে, তবে তা অর্থহীন হতে বাধ্য।
অবিলম্বে তাই নাগরিকদের মতামতের ভিত্তিতে ঢাকাসহ আমাদের সব শহরগুলোর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে হবে এবং সে রোডম্যাপ অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। মিডিয়া এক্ষেত্রে নগর কর্তৃপক্ষ ও নাগরিকদের মধ্যে সংলাপ আয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
নগর ব্যবস্থাপকের (সিটি ম্যানেজার) পদ সৃষ্টি
একটা শহরের প্রধান এবং সবচাইতে দুরূহ কাজ কিন্তু এর ব্যবস্থাপনা। একজন দক্ষ নগর ব্যবস্থাপকই পারে একটা শহরকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে, নগর প্রশাসনের সব কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে। আধুনিক বিশ্বে সিটি ম্যানেজার তাই নগর প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ, এমন কী মেয়রের চাইতেও। আমাদের মনে রাখতে হবে মেয়র একটি রাজনৈতিক পদ এবং প্রতি পাঁচ বছর পরপর মেয়র পরিবর্তন হয়। মেয়রের নগর ব্যবস্থাপনায় কোন প্রশিক্ষণ থাকে না এবং তার দরকারও নেই। মেয়রের সহযোগী হিসেবে সিটি ম্যানেজাররাই এ কাজ করে। যে যত সফল মেয়র খোঁজ নিলে দেখা যাবে তার সাফল্যের পেছনে রয়েছে একজন দক্ষ নগর ব্যবস্থাপক ও তার সহযোগীরা। একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা আরো পরিষ্কার হবে। যেমন- আমাদের মন্ত্রণালয়গুলোতে রাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত মন্ত্রী হচ্ছেন মন্ত্রণালয়ের প্রধান, কিন্তু সচিব ছাড়া কার্যত মন্ত্রণালয়গুলো অচল। ঠিক তেমনি সিটি ম্যানেজারবিহীন শুধু রাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত মেয়র পদ নিয়ে আমাদের নগর প্রশাসনগুলোও বর্তমানে অচল অবস্থায় আছে।
সিটি ম্যানেজার পদগুলিতে সাধারণত নগর পরিকল্পনায় অভিজ্ঞতার পাশাপাশি সংগত কারণেই লোক প্রশাসনে দক্ষতা ও ব্যবসা প্রশাসন সম্পর্কে ধারণাও বিবেচনা করা হয়। তিন পেশার প্রয়োজনীয় মিশেলে তৈরী এই পদ তাই নগর প্রশাসনের সবচেয়ে শীর্ষস্থানীয় ও গুরুত্বপূর্ণ পদ। আমাদের নগর প্রশাসণগুলোকে কার্যকর এবং রাজনীতির প্রভাবমুক্ত করতে চাইলে সিটি ম্যানেজার নিয়োগের বিকল্প নেই।
যমজ শহরের সন্ধানেঃ সিস্টার সিটি কনসেপ্ট
বর্তমান পৃথিবীতে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্পর্কের গুরুত্ব অপরিসীম। মানুষে মানুষে যেমন সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তেমনি পৃথিবীর দু’প্রান্তের দু’টি শহরও পরস্পরের সাথে মেলবন্ধনে আবদ্ধ হয়। এ ধারণাকে বলা হয় ‘টুইন সিটি’ বা ‘সিস্টার সিটি’ কনসেপ্ট। মূলত দু’টি অচেনা শহরের নাগরিকদের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময় এর মূল উদ্দেশ্য হলেও উন্নয়নশীল দেশের শহরগুলো উন্নত দেশের শহরগুলোর সাথে এভাবে সম্পর্ক সৃষ্টি করে নগরীর উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কার্যক্রমে সহায়তা পেয়ে থাকে। তাছাড়া পর্যটনের প্রসারেও এর ভূমিকা রয়েছে। ধরা যাক, ঢাকা বিদেশের কোন শহরের সিস্টার সিটি হল। সেই শহরের অধিবাসীদের অনেকেই তখন ঢাকাকে জানতে বাংলাদেশে ভ্রমণে আগ্রহী হবে। দুঃখের বিষয়, পাশের দেশ ভারতের অনেকগুলো শহর পৃথিবীর বড় বড় শহরের সিস্টার সিটি হলেও আমাদের কোন শহর এখনো এ তালিকায় নেই। অথচ নগর কর্তৃপক্ষগুলো একটু উদ্যোগ নিলেই এটা হয়ে যায়; এতে পয়সা খরচের কোন ব্যাপার নেই, বরং পয়সা আসার রাস্তা হবে।
© তানভীর ইসলাম
ঢাকার নগর পরিকল্পনাঃ সমস্যা ও সম্ভাবনা ০৪
টেকসই নগর পরিকল্পনা ও ঢাকার সম্ভাবনা
আজকাল টেকসই উন্নয়ন, টেকসই অর্থনীতি ইত্যাদি বাজারে খুব চালু শব্দ। টেকসই উন্নয়নের সবচেয়ে জনপ্রিয় সংজ্ঞাটি সম্ভবত প্রদান করেছিল জাতিসংঘের বিশ্ব পরিবেশ ও উন্নয়ন কমিশন (World Commission on Environment and Development ), ‘ব্রান্টল্যান্ড কমিশন’ নামে যা বিখ্যাত। ১৯৮৭ সালে “Our Common Future” শীর্ষক রিপোর্টে তারা টেকসই উন্নয়নের যে সংজ্ঞা দিয়েছিল তা নিম্নরূপ-
Development that meets the needs of the present without compromising the ability of future generations to meet their own needs. [যে উন্নয়ন ভবিষ্যত প্রজন্মের চাহিদার সাথে আপোষ না করে বর্তমানের চাহিদাকে পূরণ করে]
‘টেকসই’ শব্দের মূল কথা এটাই- এমন কিছু করা যাবে না যা ভবিষ্যত প্রজন্মকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। আমরা শুধু আমাদের বর্তমান চাহিদার কথা ভেবে যা খুশী করে চলবো, তা হবে না; ভবিষ্যত চাহিদার দিকে দৃষ্টি রেখে বর্তমানের চাহিদাকে পূরণ করতে হবে।
মূলত এ ধারণাকে পুঁজি করে আশির দশকের শুরুর দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নব্য নগরবাদ (New Urbanism) নামক নগর পরিকল্পনার নতুন ধারা সূচিত হয়। এখানে এর প্রেক্ষাপট একটু বর্ণনা করি। বিংশ শতকের গোড়ায় যান্ত্রিক-গাড়ী এবং মধ্যপ্রাচ্যে তেল আবিষ্কারের পর থেকে উন্নত বিশ্বে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ শহর গড়ে উঠেছিল ছোট গাড়ী চলাচলকে কেন্দ্র করে- এজন্য এসব শহরকে অনেক সময় ‘অটোমোবাইল টাউন’ও বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের আন্তরাজ্যীয় সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা (Interstate Highway) তো এক বিশাল বিস্ময়, যা গড়ে উঠেছে এই ছোট গাড়ী চলাচলকে কেন্দ্র করেই। কর্মব্যস্ত শহরের বাইরে নিরিবিলি বসবাসের জন্য ব্যাপক হারে গড়ে উঠেছে অনেক শহরতলী (Urban Sprawl) যেগুলো উড়াল পথ (Elevated Way) এবং বড় বড় রাস্তার মাধ্যমে সংযুক্ত। মূল শহরকেও আবার আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প ইত্যাদি অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছে (i.e. zoning) যেখানে কর্ম, বিনোদন, শিক্ষা ইত্যাদি প্রয়োজনে যেতে হলে গাড়ী ব্যবহার না করে উপায় নেই।
নব্য নগরবাদীরা বলছেন গাড়ী-কেন্দ্রিক এ শহরগুলো মোটেও টেকসই নয়। কারণ-
প্রথমত, জীবাশ্ম জ্বালানী নির্ভর গাড়ী পরিবেশ দূষণ করে; অধিক গাড়ী এবং অধিক দূরত্ব মানে অধিক দূষণ। তারা বলছেন, মানুষের চাহিদাগুলোকে যদি স্বল্প দূরত্বের মধ্যে মিটানো যায়, তবে গাড়ীর উপর এ নির্ভরতা ও পরিবেশ দূষণ অনেক কমানো যায়।
দ্বিতীয়ত, উড়াল পথ এবং বড় বড় রাস্তা নির্মাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণে খরচ অনেক বেশী হয় এবং প্রচুর জায়গা লাগে। তুলনামূলকভাবে রেলপথ নির্মাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণে খরচ ও জায়গা কম লাগে এবং পরিবেশ দূষণও কম হয়।
তৃতীয়ত, অধিক শহরতলী সৃষ্টির ফলে কৃষিজমি ও খোলা জমি ব্যাপক হারে হ্রাস পাচ্ছে যা উদ্বেগজনক। আমরা ইতিমধ্যেই সারা পৃথিবীতে খাদ্য সংকট দেখছি, ভবিষ্যতে তা আরো ভয়াবহ হতে পারে।
তাহলে, নব্য নগরবাদীদের ধারণা অনুযায়ী একটা টেকসই নগর কীরকম হতে পারে? এটা অঞ্চলভিত্তিক না হয়ে হবে সব কিছুর মিশ্রণ। মানুষ যেখানে থাকবে সেখানেই সে বিনোদনের জন্য হেঁটে হেঁটে কোন সিনেমায় যাবে, বা কোন কফি শপে, এমন কী কাজেও যেতে পারে। বাড়ীর নীচে বা কাছাকাছি দূরত্বে ছোট ছোট দোকান-পাট থাকবে যা তার দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করবে। এর ফলে গাড়ীর উপর তাকে নির্ভরশীল হতে হবে না। আর যদি কর্মস্থল দূরে থাকে বা দূরে কোথাও যেতে হয়, তবে রেল বা গণযোগাযোগ ব্যবস্থা থাকবে। মোট কথা, ছোট গাড়ীর উপর নির্ভরতা কমাতে হবে। আমাদের শহরগুলোতে যেখানে রাস্তাঘাট এমনিই কম, সেখানে ছোট গাড়ীর প্রভাব আরও ভয়াবহ। একটা উদাহরণ দিচ্ছি। ধরা যাক, একটা ছোট গাড়ীতে সবোর্চচ চার জন বসতে পারে এবং একটা বাসে চল্লিশ জন। বাসের লোকগুলোকে যদি গাড়ীতে পাঠানো হয়, তাহলে আমাদের সবর্নিম্ন দশটা ছোট গাড়ী লাগবে। চিন্তা করে দেখুন, দশটা গাড়ী রাস্তায় কত জায়গা নেবে আর কি পরিমাণ দূষণ হবে; সে তুলনায় সমপরিমাণ লোকের জন্য মাত্র একটা বাসের জায়গা আর দূষণ কি পরিমাণ হবে। আর রেলের তো কথাই নেই। যাত্রীও বেশী নিতে পারে, আবার যেহেতু ভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে তাই রাস্তার উপরও কোন চাপ পড়ে না।
যুক্তরাষ্ট্রের অনেক শহরে দেখা যায়, যার গাড়ী নেই, সে চাকরী পায় না। গণযোগাযোগ ব্যবস্থা তাই বৈষম্য কমাতেও সাহায্য করে। এছাড়া শহরগুলো মিশ্র এলাকা হিসেবে গড়ে ওঠার ফলে জায়গার মূল্য কমে আসে। শুধু আবাসিক বা শুধু বাণিজ্য এরকম এলাকায় জায়গার দাম সবসময় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরেই থাকে। আর শহরতলী সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা না থাকায় শহরের বাইরে অবস্থিত কৃষি ও খোলা জমিগুলোও রক্ষা পায়।
নব্য নগরবাদীরা বর্তমানের ‘তথাকথিত আধুনিক’ শহরের পরিবর্তে যে ‘টেকসই নগরের’ কথা বলছেন তা থেকে আমাদের বাংলাদেশের শহরগুলো কিন্তু খুব বেশী দূরে নেই। ‘নব্য নগরবাদ’ ধারণা মূলত নস্টালজিক যা গাড়ী-পূর্ব যুগে আমাদের ফিরে যেতে বলে। ঢাকা শহরের মাত্র তিন শতাংশ লোক গাড়ী ব্যবহার করে, দেশের অন্যান্য শহরগুলোতে তো আরও কম। এছাড়া উন্নত বিশ্বের শহরগুলোতে গাড়ী-কেন্দ্রিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন যেমন হয়েছে আমাদের শহরগুলোতে তার কিছুই হয় নি। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠার ফলে আমাদের শহরগুলো মিশ্র একটা রূপ নিয়েছে। একটু অন্যভাবে যদি দেখি উন্নত বিশ্বের তুলনায় আমরা এখনো মূলত সেই গাড়ী-পূর্ব যুগেই বসবাস করছি। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যগুলো আমরা হেঁটে ঘরের পাশের মুদি দোকান থেকেই কিনি। আমাদের অধিকাংশের প্রধান যানবাহন রিকশা যার কোন পরিবেশ দূষণ নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের মত একটি পুঁজিবাদী দেশে যেখানে তেল ও গাড়ী কোম্পানীগুলোর পুঁজির জোর বেশী সেখানে ‘টেকসই নগরের’ ধারণা বাস্তবায়ন যেমন খুব কঠিন (ধীর গতিতে কিছু কাজ যদিও হচ্ছে), তেমনি বিস্ময়করভাবে আমাদের পশ্চাৎপদতা, আমাদের শহরগুলিতে এখনো গাড়ী-পূর্ব যুগের সেই আবহ ‘টেকসই নগর’ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমাদেরকে তাদের চাইতে অনেক এগিয়ে রেখেছে; ‘শাপে বর’ হিসেবেই যাকে বলা যায়। আমাদের এখন যা প্রয়োজন তা হলো- অপরিকল্পিতভাবে মিশ্র এলাকা হিসেবে গড়ে ওঠা শহরগুলোয় একটু পরিকল্পনার ছোঁয়া আনা এবং তার জন্য সুষ্ঠু নীতিমালা প্রণয়ন জরুরী। আমি চাইলাম আর দোকান দিয়ে দিলাম তা হবে না; বরং মানুষের চাহিদা আর পরিবেশের সাথে তা সংগত কিনা যাচাই করে অনুমতি দিতে হবে। আর যা কিছু সংগত নয়, তা উচ্ছেদ করতে হবে।
রিকশা যদিও পরিবেশ দূষণ করে না, কিন্তু এটি একটি অমানবিক বাহন। তাছাড়া রাস্তা সাধারণত অযান্ত্রিক বাহনের কথা চিন্তা করে বানানো হয় না। রিক্সার উপর নির্ভরতা কমিয়ে আমাদের ছোট ছোট দূরত্বে হাঁটার অভ্যাস করতে হবে। তার জন্য পথচারীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো এবং হাঁটাচলার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যা এখন একেবারেই নেই। সরকার সম্প্রতি ঢাকার জন্য ২০ বছর ব্যাপ্তির ‘কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা’ (এসটিপি) হাতে নিয়েছেন যাতে পথচারীদের ব্যাপারটা অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করলেও বাজেটে এর জন্য বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল। পরিকল্পনায় আরও নতুন যেসব উড়াল পথ তৈরীর প্রস্তাবনা আছে সেগুলোর ব্যাপারে আরো চিন্তা-ভাবনা করা উচিত। কারণ প্রথমত এগুলো টেকসই অপশন নয়, এগুলো রাস্তায় ছোট গাড়ীকেই আরো বেশী প্রমোট করবে; দ্বিতীয়ত শুনেছি এর অধিকাংশ কোন ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের চাপে করা করা হয়েছে। তাই প্রয়োজনে এ খাত থেকে অর্থ সরিয়ে পথচারীদের খাতে ব্যয় করা যেতে পারে।
আমাদের উড়াল পথের চেয়ে বেশী প্রয়োজন আমাদের গণযোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি। বাস সার্ভিস, নেটওয়ার্ক এগুলোও আরো উন্নত করতে হবে যেন বেশী লোক এগুলো ব্যবহারে উৎসাহিত হয়। মোট কথা, বাধ্যতামূলকভাবে ছোট দূরত্বে হাঁটা এবং দূরপাল্লার দূরত্বে গণযোগাযোগ ব্যবস্থা ‘সবার জন্য চালু’ করতে যা যা করা প্রয়োজন তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা হলে ঢাকার পরিবেশ, যানজট ইত্যাদির অভাবনীয় উন্নতি হবে এ আশা করাই যায়।
পরিশেষে বলব ‘টেকসই নগর’-এর ধারণা পরিবেশের উন্নতির পাশাপাশি আমাদের শহরগুলোকে আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একটি সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে । এ সুযোগকে কাজে লাগানো উচিত।
© তানভীর ইসলাম
ঢাকার নগর পরিকল্পনাঃ সমস্যা ও সম্ভাবনা ০৩
ঢাকাঃ একটি আদর্শ প্রাইমেট শহর
প্রথম পর্বে সংক্ষেপে ঢাকার নগর পরিকল্পনার ইতিহাস এবং দ্বিতীয় পর্বে এ বিশাল নগরীর জন্য পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ব্যাপারে প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার কথা বলা হয়েছে। কিন্ত্ত আমরা সবাই জানি ঢাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা এর বিপুল জনসংখ্যা এবং তার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি যা শহরটিকে প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। জনসংখ্যার স্বাভাবিক বৃদ্ধি বা প্রবাহ ব্যতিরেকে সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন খুবই দুরূহ ব্যাপার। কাজেই অপরিকল্পিত নগরায়নের জন্য শুধু নগর কর্তৃপক্ষ বা রাজউককে দায়ী করা সমীচিন হবে না; বরং এর জন্য দেশের নীতি-নির্ধারকরাই দায়ী যাদের দূরদৃষ্টির অভাব আজকের এ পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে।
আমরা দেখেছি স্বাধীনতার পর থেকেই মূলত ঢাকার জনসংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বাড়তে শুরু করে এবং তা এখনো ক্রমবর্ধমান। মানুষ ঢাকায় আসে কাজের জন্য, শিক্ষার জন্য, বাণিজ্যের জন্য, চিকিৎসার জন্য, এবং আরো নানাবিধ প্রয়োজনে। আমাদের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এমনই যে সচিবালয়ের সই ছাড়া কিছুই হয় না। তাই সই নেবার জন্য হলেও ঢাকায় অফিস খুলতে হয়। প্রশাসনের কারণে আমাদের অর্থনীতি, বাণিজ্যও ঢাকাকেন্দ্রিক। আমরা গার্মেন্টসগুলো তৈরী করতে দিয়েছি ঢাকায়। গ্রাম থেকে নদী ভাঙ্গা মানুষ তাই সেখানে কাজ করতে আসে, শহরে বস্তি গড়ে ওঠে। দেশের সব সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আমরা ঢাকায় তৈরী করে রেখেছি। আমাদের সংস্কৃতি, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ঢাকাকেন্দ্রিক। আমাদের রাজনীতি ঢাকাকেন্দ্রিক। মোট কথা নীতি-নির্ধারকদের দূরদর্শিতার অভাবে বাংলাদেশের সবকিছুই ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে গড়ে উঠেছে এবং দ্বিতীয় কোন শহর ঢাকার কাছাকাছি দাঁড়াতে পারে নি। এর ফলে ঢাকামুখী জনসংখ্যার যে চাপ তা কোনভাবেই রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না এবং ঢাকার জন্য গৃহীত যে কোন নগর পরিকল্পনা তা যত সুষ্ঠুই হোক না কেন, ব্যহত হচ্ছে। নগর পরিকল্পনার পরিভাষায় একটি দেশে এককভাবে নানাবিধ কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে ওঠা ঢাকার মতো শহর যার ওপর পুরো দেশ নির্ভরশীল থাকে- এ ধরনের শহরগুলোকে বলা হয় প্রাইমেট সিটি। কোন দেশে প্রাইমেট শহরের অস্তিত্ব মূলত দেশটিতে উন্নয়নের ভারসাম্যহীনতাকেই নির্দেশ করে এবং আমাদের মত জনসংখ্যাবহুল উন্নয়নশীল দেশে অব্যবস্থাপনার কারণে প্রাইমেট শহর সাধারণত বিপর্যয় ডেকে আনে।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য কি করতে হবে তা মোটামুটি আমরা সবাই জানি। যত দ্রুত সম্ভব দেশের অন্যান্য শহরগুলিতে উন্নয়ন ঘটাতে হবে, ঢাকার উপর থেকে নির্ভরশীলতা পর্যায়ক্রমে অন্যান্য শহরগুলিতে স্থানান্তর করতে হবে। এর প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে যেটা সহজেই করা যায় তা হল প্রশাসনকে রাজধানী থেকে সরিয়ে নেয়া। কিছুদিন আগে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালা লামপুরের ওপর থেকে চাপ কমানোর জন্য পুত্রজায়ায় প্রশাসনিক কেন্দ্র স্থানান্তর করা হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এটা একটা ভাল উদাহরণ হতে পারে, যেখানে ঢাকার অবস্থা কুয়ালা লামপুরের চাইতে অনেক শোচনীয়। তবে আমলাদের মর্জির ওপরই বোধহয় এটা অনেকাংশে নির্ভর করছে। তাই অনেক দিন থেকে ঢাকার ব্যাপারে এ ধরণের পদক্ষেপ নেবার কথা শোনা গেলেও, আজ পর্যন্ত তার কোন লক্ষণ দেখা যায় নি!
© তানভীর ইসলাম
ঢাকার নগর পরিকল্পনাঃ সমস্যা ও সম্ভাবনা ০২
মূল সমস্যা-গোড়ায় গলদ
টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট-১৯৫৩ এর যে ধারায় ডিআইটি সৃষ্টি হয়েছিল, সেখানে ডিআইটিকে মূলত একটি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (development authority) হিসেবে গঠন করা হয়েছিল। ১৯৫৮ সালে আইন সংশোধন করে এর উপর পরিকল্পনার (planning) ভার ন্যস্ত করা হয়। কিন্তুসে অনুযায়ী এর প্রাতিষ্ঠানিক কোন পরিবর্তন আজও করা হয় নি!
একটি শহরে নগর কর্তৃপক্ষের হাতেই সাধারণত নগর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ভার নিয়োজিত থাকে। সেখানে রাজউকের মত পরিকল্পনা ও উন্নয়ন সহযোগী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থাকতেই পারে। কিন্তু অতীতের মত বর্তমানেও ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ভূমিকা মূলত রাজস্ব আদায় এবং রক্ষণাবেক্ষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মাত্র একজন প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ এবং দু’তিনজন সহকারী নিয়ে ডিসিসি-র নগর পরিকল্পনা বিভাগ গঠিত, বিশাল জনসংখ্যার একটি শহরের জন্য যা খুবই অপ্রতুল।
ফলে কোন প্রাতিষ্ঠানিক এবং কাঠামোগত সংস্কার ছাড়াই (পরিকল্পনার ক্ষেত্রে) ঢাকা মহানগরীর পরিকল্পনা প্রণয়ণ, উন্নয়ন এবং বিল্ডিং নিয়ন্ত্রণের জন্য রাজউক একছত্র ক্ষমতার অধিকারী সংস্থা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এতগুলো দায়িত্ব একসাথে নিলেও রাজউক তার আগের মূল দায়িত্ব অর্থাৎ ভূমি বা প্লট উন্নয়নের দিকেই বেশী মনোযোগী। পরিকল্পনা প্রণয়ণ ও বাস্তবায়নের দিকটি উপেক্ষা রেখে প্লট উন্নয়ন এবং বিল্ডিং নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার অপব্যবহারের ফলে রাজউক বর্তমানে একটি দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে।
রাজঊক বা ডিআইটির সম্ভাব্য এ পরিণতির কথা উপলব্ধি করে স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে ‘ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি অর্ডিন্যান্স ১৯৭৪’ পাস করা হয়েছিল, যেখানে ডিআইটিকে সরিয়ে ‘কলকাতা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’র মত আরও অধিক পরিকল্পনা প্রণয়ণ ও বাস্তবায়নের ক্ষমতাসম্পন্ন সংস্থা গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্ত্ত রাজনৈতিক ডামাডোলে পড়ে এ অধ্যাদেশটি কালক্রমে বিলুপ্ত হয়ে যায়। ১৯৮১ সালে শাঙ্কল্যান্ড কক্স ‘ঢাকা ইন্টিগ্রেটেড প্ল্যান’-এর যে রিপোর্ট প্রকাশ করে তাতে ঢাকা মহানগরীর পরিকল্পনা ও উন্নয়নের জন্য দুটি পৃথক সংস্থা গঠনের সুপারিশ করা হয়। এর একটি ছিল ‘ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’, যা ডিআইটিকে সরিয়ে ভূমি উন্নয়ন এবং নিয়ন্ত্রণ করবে। অন্যটি ছিল ‘ঢাকা মেট্রোপলিটন প্ল্যানিং অথরিটি’– যার কাজ হবে পরিকল্পনা প্রণয়ণ, বাস্তবায়ন, নাগরিক সুবিধা প্রদানকারী বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধন এবং ভূমি উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণের কাজ তদারকি করা। কিন্ত্ত আগের পর্বেও বলেছি দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ রিপোর্ট কখনো গৃহীত হয় নি।
যে উদ্দেশ্য নিয়ে রাজউক গঠন করা হয়েছিল তা আজ মোটামুটিভাবে ব্যর্থ বলা যায়। এর সমাধানে ‘ঢাকা ইন্টিগ্রেটেড প্ল্যান’(১৯৮১)-এর রিপোর্টে ঢাকা মহানগরীর পরিকল্পনা (planning) ও উন্নয়নের (development) জন্য পৃথক দুটি কর্তৃপক্ষ গঠনের যে পরামর্শ দেয়া হয়েছে, তা বিবেচনা করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে নতুন আর কোন প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি না করে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে মহানগরীর পরিকল্পনা এবং রাজউককে ডিসিসির তদারকিতে শুধু উন্নয়নের ভার দেয়া যেতে পারে। তবে, পরিকল্পনার ভার ডিসিসি-র কাছে ন্যস্ত করার আগে এর নগর পরিকল্পনা বিভাগকে অবশ্যই মহানগরীর চাহিদা অনুপাতে ঢেলে সাজাতে হবে; লোকবল ও সুযোগ-সুবিধা প্রচুর বাড়াতে হবে। একইভাবে, ঢাকা মহানগরীর বাইরের এলাকাগুলোতে (সাভার, গাজীপুরে) রাজউক পৌর কর্তৃপক্ষেগুলোর সহায়ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করতে পারে (বর্তমানে রাজউকের ক্ষমতা এখানেও একচেটিয়া)। এক্ষেত্রে, পৌরসভাগুলোতেও স্বয়ংসম্পূর্ণ নগর পরিকল্পনা বিভাগ গড়ে তোলা জরুরী।
© তানভীর ইসলাম
ঢাকার নগর পরিকল্পনাঃ সমস্যা ও সম্ভাবনা ০১
ফিরে দেখা ইতিহাসঃ
লোকালয় হিসেবে ঢাকা বেশ প্রাচীন। খ্রীষ্টিয় ৭ম শতকেও এর অবস্থিতি ছিল বলে জানা যায়। পৃথিবীর সব প্রাচীন জনপদের মত ঢাকাও অতীতে বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে বিক্ষিপ্তভাবে গড়ে উঠেছিল। মোগল আমল পযর্ন্ত একটা দীর্ঘ সময় ঢাকা কোনরকম পরিকল্পনা ছাড়াই গড়ে উঠেছিল। মোগল আমলে, ১৬০৮ সালে ঢাকা প্রাদেশিক রাজধানীর মযার্দা পায়। তবে এসময় কিছু উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য ছাড়া ঢাকা শহরের সমৃদ্ধি ও সম্প্রসারণে কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা জানা যায় না। ব্রিটিশ আমলে বর্তমান ঢাকা সিটি কর্পোরেশন ‘ঢাকা মিউনিসিপালিটি’ নামে যাত্রা শুরু করে ১৮৬৪ সালে। এর আগে ১৮২৩ সালে ঢাকার তৎকালীন কালেক্টর ওয়াল্টার সাহেবের অধীনে শহরের দেখভাল করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। ঢাকার নবাবরা এসময় ঢাকার উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। তবে এসময় ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির কাজ ছিল মূলত রক্ষণাবেক্ষণমূলক। ঢাকার জন্য আধুনিক নগর পরিকল্পনা বিষয়ক প্রথম রিপোর্ট প্রণীত হয় ১৯১৭ সালে। বিখ্যাত স্কটিশ বিজ্ঞানী ও নগর পরিকল্পনাবিদ স্যার প্যাট্রিক গেডেস (জন্ম ১৮৫৪- মৃত্যু ১৯৩২) প্রণীত এ রিপোর্টে প্লাবনভূমির উপর অবস্থিত ঢাকা শহরের জন্য একটি সুসামঞ্জস্যপূর্ণ পরিকল্পনার প্রস্তাব করা হয়। দুর্ভাগ্যক্রমে, এ সময় প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইংল্যান্ড জড়িয়ে পড়ায় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় প্রচুর অর্থ ব্যয় হওয়ার কারণে ব্রিটিশ রাজ এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আর অগ্রসর হয় নি।
পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর, পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকার জন্য ১৯৫৯ সালে রাজউকের পূর্বসূরী ডিআইটির তত্ত্বাবধানে প্রথম মাস্টার প্ল্যান তৈরী করা হয়। এখানে উল্লেখ্য, টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট-১৯৫৩-র আওতায় ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট বা ডিআইটি, ঢাকার নগর পরিকল্পনার ইতিহাসে একটি মাইলফলক। সে সময় ঢাকার পাশাপাশি নারায়নগঞ্জের জন্যও মাস্টার প্ল্যান তৈরী করা হয়। প্রায় ৩ লাখ জনসংখ্যার জন্য প্রণীত ঢাকা মাস্টার প্ল্যান স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ব্যাপক জনসংখ্যা বৃদ্ধির (১৯৭১-এর পরে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১২ লক্ষ) ফলে অনুপযোগী হয়ে পড়লেও এটা প্রায় ৪০ বছর ধরে ব্যবহৃত হয়! ১৯৭৯ সালে মহাপরিকল্পনাটির আসল মেয়াদকাল শেষ হওয়ার পর ইউএনডিপি-র অর্থায়নে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান শাঙ্কল্যান্ড কক্স ‘ঢাকা ইন্টিগ্রেটেড প্ল্যান’ নামে আরেকটি নতুন পরিকল্পনা তৈরী করেছিল, কিন্ত্ত কোন এক দুবোর্ধ্য কারণে সে পরিকল্পনা কখনো গৃহীত এবং বাস্তবায়ন হয় নি।
১৯৯৭ সালে সরকার ‘রাজউকে’র (ডিআইটির নাম ১৯৮৭ সালে পরিবর্তন করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা ‘রাজউক’ রাখা হয়) তত্ত্বাবধানে প্রণীত ‘ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান’ বা ডিএমডিপি অনুমোদন করে। এই পরিকল্পনার মেয়াদকাল ২০ বছর (১৯৯৫-২০১৫)। প্রায় ৩ বছর (১৯৯২-৯৫) সময় এবং প্রচুর অর্থ ব্যয় করে কঠিন ইংরেজীতে লেখা এ পরিকল্পনার রিপোর্টগুলো পড়লে প্রথমেই যেটা মনে হয় তা’হল,এতে প্রায় কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত ঢাকা মহানগরীর আবাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে কোন সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা দেয়া হয় নি। একটি শহরে উচচবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত তিন শ্রেণীর লোক থাকে। এই তিন শ্রেণীর লোক কোথায় থাকবে, তাদের কর্মস্থলে যাতায়াত কেমন হবে- এসব বিষয়ে দিক নির্দেশনা একটি মাস্টার প্ল্যানে থাকা অবশ্যই দরকার ছিল, যা এখানে নেই। ১৯৯২ সালে এই প্রজেক্ট যখন হাতে নেয়া হয়, তার আগে থেকেই গার্মেন্টস ঢাকার প্রধানতম অর্থনৈতিক শিল্প। দলে দলে গ্রাম থেকে নিম্নবিত্ত গার্মেন্টস শ্রমিকদের যে ঢল ঢাকায় আসছে; তারা কোথায় থাকবে, গার্মেন্টসগুলোতে কিভাবে যাবে, গার্মেন্টসগুলো কোথায় গড়ে উঠবে- তার কোন নির্দেশনা এ পরিকল্পনায় পাওয়া যায় না। ফলশ্রুতিতে আমরা দেখি, ঢাকায় অপরিকল্পিতভাবে বস্তির পর বস্তি, গার্মেন্টস ও নানা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। বর্তমানে রাজউকের মূল ভূমিকা হল বিভিন্ন এলাকায় প্লট উন্নয়ন করে সমাজের উচচবিত্তদের মাঝে বণ্টন করা- যা এটিকে উচচবিত্ত পদলেহনকারী একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। রাজউকের এই ভূমিকা টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট-১৯৫৩-এ বর্ণিত এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।
লিংক ও তথ্যসূত্রঃ
উইকিপিডিয়া
ডি আই টি ও ডিএমডিপি মাস্টার প্ল্যান
© তানভীর ইসলাম